সোমবার ১১ মে ২০২৬ - ২০:৩৬
ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর মেহেরবানী ও করুণার বহিঃপ্রকাশ

ইমাম মাহদী (আ.ফা.) তাঁর অনুসারীদের প্রতি গভীর মমতা ও ভালোবাসার কারণে তাঁদের সঙ্গে সর্বাধিক সংযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখেন। এই ভালোবাসা ও আন্তরিকতার কারণেই তিনি তাঁদের দুঃখ-কষ্টে শরিক হন। যেমন—একজন মা তার সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে সন্তানের অসুস্থতায় নিজেও ব্যথিত হয়ে পড়েন; আবার সন্তানের সুস্থতা ও আনন্দে নিজেও প্রফুল্ল হয়ে ওঠেন। কারণ সন্তান তার কাছে প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: “আদর্শ সমাজের দিকে” শিরোনামে মাহদাভিত্তিক এই ধারাবাহিক আলোচনা, ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-সংক্রান্ত শিক্ষা ও জ্ঞান প্রচারের লক্ষ্যে সম্মানিত পাঠকদের জন্য উপস্থাপিত হচ্ছে:

ইমামে গায়েব (আ.ফা.)-এর উপকারিতা প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা তাঁর অস্তিত্বগত প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করেছি এবং ব্যাখ্যা করেছি যে, জগতের স্থিতি ও সমগ্র সৃষ্টির জীবনধারা তাঁর পবিত্র সত্তার উপর নির্ভরশীল। আর এ পর্বে আমরা তাঁর অসীম ভালোবাসার কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করছি, যা বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। যেন স্পষ্ট হয়—গায়েব থাকা সত্ত্বেও দয়া ও করুণার এই ইমামের ভালোবাসা সর্বত্র বিস্তৃত এবং প্রত্যেকের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী সকলকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। তাঁর অনুগ্রহ যেন এক অবিরাম প্রবাহমান ঝর্ণা—নিরবচ্ছিন্ন ও চিরধারা।

একজন মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো—ধর্মীয় ভাইদের সঙ্গে সহমর্মিতা ও সহানুভূতি। ইসলামী সমাজে মুমিনরা যেন একটি দেহের ন্যায়; যেখানে একজনের কষ্ট অন্যদের কষ্টের কারণ হয় এবং একজনের আনন্দ অন্যদের আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে। কারণ কুরআনের ভাষায় তারা পরস্পর ভাই।

বহু হাদীসে আহলে বাইতের ইমামগণ (আ.) তাঁদের অনুসারীদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমব্যথিতার কথা বর্ণনা করেছেন। এই অনুভূতি তাঁদের ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ, যা অনুসারীদের জন্য প্রশান্তি ও সান্ত্বনার উৎস এবং জীবনের উত্থান-পতনে ধৈর্য ও স্থিতিশীলতা জোগায়।

ইমাম রেজা (আ.) বলেন,

 مَا مِنْ أَحَدٍ مِنْ شِیعَتِنَا یمْرَضُ إِلَّا مَرِضْنَا لِمَرَضِهِ وَ لَا اغْتَمَّ إِلَّا اغْتَمَمْنَا لِغَمِّهِ وَ لَا یفْرَحُ إِلَّا فَرِحْنَا لِفَرَحِه‏.


কোনো একজন শিয়া অসুস্থ হলে আমরা তার অসুস্থতায় অসুস্থ হই; সে দুঃখিত হলে আমরা তার দুঃখে শোকাহত হই; আর সে আনন্দিত হলে আমরা তার আনন্দে আনন্দিত হই। [বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৬৫, পৃষ্ঠা ১৬৭]

অতএব, ইমাম তাঁর অনুসারীদের প্রতি গভীর মমতার কারণে তাঁদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং তাঁদের দুঃখ-কষ্টে অংশীদার হন। এটি ঠিক সেই মায়ের মতো, যিনি সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তার কষ্টে নিজেও কষ্ট পান এবং তার আনন্দে নিজেও আনন্দিত হন।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন,

 وَ اللَّهِ إِنِّی أَرْحَمُ بِکُمْ مِنْ أَنْفُسِکُم‏.

আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের প্রতি তোমাদের নিজেদের থেকেও অধিক দয়ালু। [বাসায়েরুদ্দারাজাত, পৃষ্ঠা ২৬৫]

অতএব, ইমামের ভালোবাসা অন্য সব ভালোবাসা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি এক নির্মল, নির্লোভ ও অসীম ভালোবাসা—যা অন্তরের গভীরতা থেকে উৎসারিত। এ কারণেই তিনি তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে আত্মিক ও অস্তিত্বগত বন্ধনে আবদ্ধ।

এই ঐশী ভালোবাসার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর বাণীতে এভাবে বর্ণিত হয়েছে—

 إِنَّهُ أُنْهِی إِلَی ارْتِیابُ جَمَاعَه مِنْکُمْ فِی الدِّینِ وَ مَا دَخَلَهُمْ مِنَ الشَّکِّ وَ الْحَیرَه فِی وُلَاه أَمْرِهِمْ فَغَمَّنَا ذَلِکَ لَکُمْ لَا لَنَا وَ سَأَوْنَا فِیکُمْ لَا فِینَا لِأَنَّ اللَّهَ مَعَنَا فَلَا فَاقَه بِنَا إِلَی غَیرِه‏.

আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তোমাদের একদল দ্বীনের ব্যাপারে সন্দেহে পতিত হয়েছে এবং নিজেদের নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে সংশয় ও বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এই বিষয়টি আমাদের জন্য দুঃখের কারণ হয়েছে—তোমাদের জন্য, আমাদের জন্য নয়। তোমাদের ব্যাপারে আমরা ব্যথিত হয়েছি, নিজেদের জন্য নয়। কারণ আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন; সুতরাং তাঁর উপস্থিতিতে আমাদের অন্য কারো প্রয়োজন নেই। [বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৫৩, পৃষ্ঠা ১৭৮]

ইমাম মাহদী (আ.ফা.)’র ভালোবাসা স্বার্থহীন, সীমাহীন এবং গভীরভাবে মানবিক। তিনি গায়েব থাকলেও তাঁর হৃদয় তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে সর্বদা সংযুক্ত। তাঁদের সুখে-দুঃখে তিনি সমানভাবে অংশগ্রহণ করেন—এটাই তাঁর অসীম করুণার বাস্তব বহিঃপ্রকাশ।

এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…

উৎস: ‘নেগিনে অফারিনেশ’ থেকে (সামান্য সম্পাদনাসহ) গৃহীত।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha